সৈয়দ বংশের ইতিবৃত্ত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

0
1285

সৈয়দ হোসাইন উল হক
ওসমানীয়া খেলাফত যুগে নবী মোহাম্মদের বংশধরগণ সবুজ পাগড়ী ব্যবহারের মাধ্যমে এক স্বকীয় পরিচয়ের স্বাক্ষর বহন করতেন
রুচিবোধের কারণেই, পারতপক্ষে কোনও ব্যক্তি বা বংশের নাম উল্লেখ করে কিছু বলি না। ব্যক্তির বা বংশের নাম ধরে টানাটানি করাটা নেহায়েত অপ্রযোজ্য রুচির ঠেকে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের নাম ধরেও টানাটানি করি না।সংঘ-সংগঠনের নাম চলেই আসে, এটুকু ঠেকানো যায় না। এবং সংঘ-সংগঠনের নামও অন্য কারণে আসে না। মূলত আসে মতাদর্শের কারণে। আর মতাদর্শের নাম আসে স্রেফ সেটার ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে।না হলে, আল্লাহরই শপথ, আমরা এমনকি কোনও মতাদর্শ (ফির্কা, ইজম) নিয়েও কথা বলতাম না। না কথা বলতাম কোনও বংশ নিয়ে। সত্যবোধের উপলব্ধিতে ডুবে থাকা এতই মহৎ বিষয়, তাতেই শান্তি এবং তাতেই পরিণতি… সেখানে কোনও ধর্ম, মতাদর্শ, সংঘ-সঙ্গঠনের নামই আসার কথা নয়, ব্যক্তির বা বংশের নাম তো আরো বহু পরে! কিন্তু ব্যক্তিরগুষ্টির বা বংশের নাম উল্লেখ করতে হল পরিস্থিতির সাপেক্ষে।
যাই হোক মূলবক্তব্যে আসি, সৈয়দ অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ। ধর্মীয় ও সামাজিক দিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ। সৈয়দ বা স্যৈয়দ বা সাইয়্যেদ সায়্যিদ ইংরেজি ভাষায়: Sayed also spelled Sayyid, Seyd, Syed, Saiyid, Seyed and Seyyed (আরবি ভাষায়: سيد‎; meaning Mister) (plural Sadah আরবি ভাষায়: سادة‎, Sādah) হল এমন একটি সম্মানসূচক উপাধি যা ধারা ইমাম আলী আ: এর ওরুসে এবং নবী নন্দিনী মা ফাতেমা (আ:) এর গর্ভে সন্তান ইমাম হাসান ও হোসাইনের (আ:) বংশধারার নবী মোহাম্মদ (সা:) বংশধরগণকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।
নবী বংশ (আহলে বাইত) আ: ফযিলত’এর উপর কুর’আনের আয়াত ও হাদিস’এ রসূল (সঃ):-
১: আয়াতে তাতহীর:
‎‪إنما يريد الله ليذهب عنكم الرجس أهل البيت ويطهركم تطهيرا ‬
হে রসূলের আহলেবাইত! আল্লাহ তোমাদের কে সমস্ত অপবিত্রতা জিনিস থেকে দুরে রেখেছেন, আর যেমন ভাবে পবিত্রতা রাখা উচিত তেমন ভাবে পবিত্র বানিয়েছেন। সুরায়ে আহজাব, আয়াত-৩৩।
২: আয়াতে মুওয়াদ্দাত:
‎قل لا أسئلكم عليه أجرا إلا المودة في القربى
হে আমার রসূল! তুমি ওদের বলে দাও আমি তোমাদের কাছ থেকে কোন পারিশ্রমিক চাইনা শুধু আমার আহলে বাইত এর সাথে ভালবাসো(মুওয়াদ্দাত)। সুরায়ে শুরা, আয়াত-২৩।
৩: আয়াতে মোবাহেলা:
‎(فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ )
হে আমার রসূল বলে দাও তোমরা তোমাদের পুত্রদের নিয়ে এসো আমি আমার পুত্রদেরকে নিয়ে আসছি আর তোমরা তোমাদের মহিলাদের কে নিয়ে এসো আমি আমারদের মহিলাদেরকে নিয়ে আসছি আর তোমরা তোমাদের নাফসকে নিয়ে এসো আমি আমার নাফসকে নিয়ে আসছি, তার পর এক অপরের উপর বদ্দুওয়া ও আল্লাহোর লানাত মিথ্যাবাদিদের উপর পাঠায়। সুরায়ে আলে ইমরান, আয়াত-৬১।
হাদিস ও রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, পুত্র’এর স্থানে হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসায়েন (আলায়হেমাস সালাম) ও মহিলার স্থানে মা’ফাতেমা (সালামুল্লাহ আলায়হা) ও রসূল (স.) এর আত্মার স্থানে হযরত আলি (আ.) কে নিয়ে গিয়েছিলেন।
মুসলিম শরিফের হাদিস:
‎(وَلَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ ‪}‬ ‫فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ ‬} [آل عمران: 61] دَعَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلِيًّا وَفَاطِمَةَ وَحَسَنًا وَحُسَيْنًا فَقَالَ: ‪)‬اللهُمَّ هَؤُلَاءِ أَهْلِي‪(‬
যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (‫فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ‬) তখন রসূল আল্লাহ (স.) আলি ও ফাতেমা, হাসান ও হুসায়েন (আলায়হেমুস সালাম) কে ডেকে বললেন: আল্লাহুম্মা হা’উলাই আহলি অর্থাত: হে আমার আল্লাহ এরাই আমার আহলে বাইত।
সহি মুসলিম, খ: ৪, প্র: ১৮৭১, হা:।
ইদানীং আরেক উপদ্রব শুরু হয়েছে। প্রায়ই বিভিন্ন ইসলামী পন্ডিৎ জ্ঞানপাপীগন এই কথাটি বেশ জোরেশোরে বলছেন যে, ইসলামে বংশধারার কোন গুরুত্ব নেই। আসলেই এ প্রসংগে এই কথাটি না বলে পারছি না যে, মহানবী (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীতে সবথেকে নির্যাতিত বংশ হচ্ছে ইমরানের বংশধর। অথচ এই ইমরানের বংশকেই স্বয়ং অাল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত সকল সৃষ্টিজগতের উপর খলীফা, ইমাম ও উলিল আমর হিসাবে মনোনীত ও নির্বাচিত করেছেন। সকল মানব ও জ্বীনকে আদেশ দেয়া হয়েছে এই বলে যে, এই ইমরানের বংশের পবিত্র ইমাম (আঃ) গন তথা আহলে বায়েতগনকে যেন সর্বদা আনুগত্য করা হয়। এবং এই অনুসরন ও আনুগত্য রাসুল (সাঃ) এর আনুগত্যের অনুরুপ। ইসলামে বংশধারার কোন গুরুত্ব নেই বলে যারা চরম মিথ্যাচারিতা করে যাচ্ছেন তাদের জঘন্য কুৎসিত মিথ্যাচারের বিরুদ্বে সংক্ষিপ্ত কিছু জবাব।
এই ইমরানের বংশের জন্যই —
“ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালাকা বাদ”।
এখনও মসজিদে যে আযান প্রচারিত হয় সেটা এই আলীর (আঃ) সন্তানের মেহেরবানী ।
“ নিশ্চ য়ই আল্লাহ নির্বাচিত করেছেন আদম ও নুহকে এবং ইব্রাহীমের বংশকে এবং ইমরানের বংশকে সকল জাতির উপরে।“
সুরা – আলে ইমরান / ৩৩ ।
ইবনে আব্বাস হতে বর্নিত হয়েছে, রাসুল (সাঃ) হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) বংশ থেকে। তাই মুহাম্মাাদ (সাঃ) ও আলে মুহাম্মাাদ অর্থাৎ মুহাম্মাাদের (সাঃ) বংশধর হযরত ইব্রাহিমের (আঃ) আহলে বাইত।
সূত্র – তাফসীরে দুররে মানসুর, ২য় খন্ড, পাতা-১৭ মিশরে মুদ্রিত।
এও বর্নিত আছে যে, আলে ইব্রাহিম, আলে ইমরান ও আলে মুহাম্মাাদের (সাঃ) নবুওয়াতের কারনে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হয়েছেন। যেহেতু রাসুল (সাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ সেহেতু তার পবিত্র বংশধারা অন্যদের চাইতে শ্রেষ্ঠ।
এছাড়াও এ প্রসংগে আরও বলা যায় যে,
ইয়াসীন, শপথ জ্ঞানগর্ভ কোরআনের, আপনি অবশ্যই রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত, আপনি সরল পথে প্রতিষ্ঠিত।’ সূরা-ইয়াসীন-১-৪।
এখানে ‘ইয়াসীন’ বলতে কী বুঝান হয়েছে ? ইয়াসীন হলেন মুহাম্মাদ (সাঃ), আর এতে কোন সন্দেহ নেই।
অষ্টম ইমাম রেযা (আঃ) এর ভাষায়, আল্লাহ্ এর মাধ্যমে মুহাম্মাাদ ও আলে মুহাম্মাাদকে এক শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
এটা এজন্য যে, আল্লাহ্ কারও ওপর সালাম প্রেরণ করেন নি, নবীগণ ব্যতীত।
মহামহিম আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন – ‘সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের ওপর সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক।’ সূরা – সাফফাত / ৭৯ ।
ইমাম রেযা (আঃ) আরও বলেন, পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে – ‘সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক মূসা ও হারুনের ওপর।’ সূরা – সাফফাত / ১২০ ।
খেয়াল করুন, আল্লাহ্ কিন্ত বলেন নি,”সালাম বর্ষিত হোক আলে নূহের ওপর”। কিংবা বলেন নি, “সালাম বর্ষিত হোক আলে ইবরাহীমের ওপর”। কিংবা বলেন নি : “সালাম বর্ষিত হোক মূসা ও হারুনের আলের ওপর” ।
তবে আল্লাহ্ বলেছেন – “সালামুন আলা আলে ইয়াসীন”। “সালাম বর্ষিত হোক আলে ইয়াসীনের ওপর”। সূরা – সাফফাত / ১৩০ ।
অর্থাৎ আলে মুহাম্মদ বা মুহাম্মাাদের বংশধর।
“এবং আমরা তাকে দিয়েছিলাম ইসহাক ও ইয়াকুবকে এবং আমরা নির্দিষ্ট করেছিলাম তাঁর বংশধরের ভিতরে নবুয়ত ও কিতাব”। সুরা – আনকাবুত / ২৭ ।
“নিঃসন্দেহে আমরা ইবরাহীমের বংশধরকে দিয়েছি কিতাব ও প্রজ্ঞা এবং আমরা তাদেরকে দিয়েছি এক বিশাল সার্বভৌম ক্ষমতা “। সুরা – নিসা / ৫৪ ।
মহান আল্লাহ আদম, নূহ, ইব্রাহিমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরদেরকে সমগ্র বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য দান করেছেন। অর্থাৎ নবুয়ত ও রেসালতের জন্য এই বংশধরকেই আল্লাহ নির্বাচিত করেছেন। এবং সুরা নিসার ৫৪ নং আয়াতে বর্নিত “সার্বভৌম ক্ষমতা” বা “মুলকান আজীম” এর ব্যাখ্যায় মাওলানা মওদুদী লিখেছেন – ‘ইমামত’।
ঐ আয়াতেই নবীবংশের প্রতি হিংসুকদের জন্য আল্লাহ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এমনকি প্রতি নামাজে নবীবংশ তথা পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) গনের প্রতি দরুদ পাঠ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ।
সৈয়্যদগণের মর্যাদা সম্মান এবং শান-শওকত দেখে কিছু মিথ্যাবাদী-স্বার্থপর হিংসাত্মক আচরন করে। এই সমস্ত নালায়েকের অবস্থা যে কি হবে, তা গায়েবের খবর দেনে ওয়ালা রাসূল অনেক আগেই ফয়সালা করে দিয়ে গেছেন, এবং এসকল মিথ্যুকদেরকে জাহান্নামী বলে ঘোষনা করেছেন।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, অর্থাৎ যারা রাসূলের বংশধরের প্রতি হেয় মনোভাব রেখে মৃত্যুবরণ করবে, তারা কখনও বেহেশেতের সুগন্ধী পাবে না।
(তাফসীরে ইবনে আরাবী, ২য় খন্ড, ৪৩৩ পৃ, তাফসীরে কবীর, ২৭ খন্ড, ১৫৫,১৬৬ পৃ, তাফসীরে রুহুল বয়ান, ৮ম খন্ড, ৩১২ পৃ, নুজহাতুল মাজালিস ১২২ পৃ, খুতবাতুল মহররম ২৬২ পৃ, আলে রাসূল-১০০পৃ), [শানে আহলে বাইত, পৃষ্ঠাঃ ৩৫১]।
ঐতিহ্যকে ধারন ও লালন করাও মানুষের আরেকটা বৈশিষ্ট। আর এসব কারনেই যখন মানুষ অর্থবিত্ত শিক্ষা সহ যাবতীয় দিক দিয়ে সচ্চল হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে সম্মান ও ঐতিহ্যের একটা ম্পিহা কাজ করে। সম্মান জিনিসটা তার প্রচেষ্টা দ্বারা অর্জন করে নিতে পারলেও ঐতিহ্য জিনিসটা তার পক্ষে কোন ভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এ সমস্যা থেকে উত্তোনের জন্যই সে যে কোন কায়দায়ই হোক কিছু মুয়ারিয়া পন্থী চক্র কৌশলগত পন্থা অবলম্বন করে আসছে সেই পনেরশত বছর ধরে। ওরা আছে ওরা থাকবে এটাই স্বাভাবিক ও চরম সত্য। বর্তমানে তথাকতিথ “পীরাগি” ব্যবসা বাজারে জমজমাট তাই চাতুরিকতায় করে ছদ্দবশে পির তরিকার আশ্রয় নিয়েছে ।এতে সুবিদা হল খুব সহজে মানুষের মধ্যে ফেৎতনা সৃষ্টি করা তথা বিদ্ধেষ ছড়ানো। এদের মুল উদ্দেশ্য হল সরাসরি এজিদিয়াবাদ প্রচার পারে না তবে মুয়াবিয়াবাদ প্রচার করাতে সচেষ্ট। এদের দুর্বল কখনো ভাববেন না এরা খুব শক্তিশালী চক্র।
এদের অন্যতম উদ্দেশ্য হল আওলাদে রাসুল(সা:) অথ্যাৎ সৈয়দগনের প্রতি বিদ্ধেষীপুর্ন আচরন তথা কুৎসাত রটনা ও হেয় প্রতিপন্ন করা। যাহা মুয়াবিয়া মসজিদের খুৎবার সুন্নতের অন্তভুক্ত করেছিল ।
আল্লাহ্ পাক বলেন, “আমি জান্নাতের মধ্যে মু’মিনদেরকে তাদের সন্তানদের সাথে মিলিয়ে দেব এবং তাদের নেক আমলে কোন ঘাটতি করা হবে না।”(সূরা তূর-২১)
অর্থাৎ কিয়ামত দিবসে নবী করীম সঃ এর মু’মিন আওলাদগণ নবী করীমের সাথেই থাকবেন। এর দ্বারা আওলাদে রাসূলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হল।
“হে মাহবুব! আপনি বলে দিন, আমি এ পথ প্রদর্শন ও ধর্ম প্রচারের বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে আমার আহলে বাইত (তথা আওলাদে রাসূলের) ভালোবাসা ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চা ই না।(সূরা শুরা-২৩) এ আয়াতের তাফসীরে আছে যে, নবী করিম সঃ বলেন ‘হে উম্মতগণ! আমার হক্বের কারণে আমার আওলাদকে ভালবাস।’ অর্থাৎ নবী আকরামের কারনেই আহলে বাইতে রাসূলকে ভালবাসা অপরিহার্য, যা অন্য কোন বংশের জন্য প্রযোজ্য হয়না।
“জেনে রাখ, গণিমতের সম্পদ হিসেবে তোমরা যা কিছু পাবে তার পাঁচটি অংশ আল্লাহ্, রাসূল, আহলে বাইতে রাসূল, এতিম এবং মিসকিনদের জন্য। (সূরা আনফাল-৪১) অর্থাৎ গণিমতের মালের মধ্যে আওলাদে রাসূলের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটা অংশ ছিল। সুন্নি মাযহাবের ইমাম শাফেয়ী রঃ এর মত ছিলঃ শুধু সে সময় নয় বরং অদ্যবধি আওলাদে রাসূলগণ তাঁদের অংশ পাবেন, সে সম্মান অন্য কোন বংশের প্রাপ্তি হয়নি।
সালাতে “আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়য়া আলে মুহাম্মদ” অর্থাৎ রসুলের “আল” বা বংশের শানে আল্লাহর কাছে দুরুদ পেশ করা ওয়াজেব।
উপরুক্ত বিষয় গুলো শিয়া সুন্নি সুফি শরিয়তি মারিফতি নির্বিশেষে সবাই নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন এবং মানেন। তার পরও একটি হাদিসের আংশিক বিক্রিত ও ভুল ব্যাখ্যাকে আশ্রয় করে অন্যান্য বংশের সাথে রসুলের বংসকে উচ্চ মর্যাদা না দিয়ে এক কাতারে করা যায় কি ??!!
ওরা তো খোদার জাত। ওরা তো “নাহনু” তথা খোদার সেই “আমরা” পরিষদবর্গ। আর আমরা গোলামের জাত। আমাদের ধর্ম ওদের প্রশংসা করা, আমাদের কর্ম ওদের প্রশংসা করা, আমাদের নামাজ আমাদের ইবাদত ওদের প্রশংসা করা।
হজরত ইমাম শাফেয়ী (রাহ:) বলতেছেন:
‎”يا اٰٰل بيت رسول الله حبكمُ فرض من الله في القران أنزلهُ
‎يكفيكم بعظيم الفخر بأنكمُ من لم يصل عليكم لا صلاة لهُ”
“হে নবী পরিবার! তোমাদের ভালবাসা আল্লাহ দিয়েছেন ফরজ করে – কুরআনে পবিত্র আয়াত নাজিল করে, তোমাদের মহান মর্যাদা বর্ননার জন্য যথেষ্ট এই, তোমাদের উপর যে দরুদ পড়বে না তার কোন নামাজ নেই।”
সুতরাং উপরে উল্লেখিত পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ দ্বারা ষ্পষ্ট ও জোরালোভাবে প্রমান হয় যে, আল্লাহ, রাসুল (সাঃ) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে (আঃ) বিশ্বের সকল সৃষ্টি থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন অর্থাৎ তাঁরা ফেরেস্তামন্ডলী, জ্বীন, মানুষ, এমন কি অন্যান্য নবীদের ওপরও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।
তাবরানী বুরাইদা হতে বর্ননা করেছেন, ‘ আমি হযরত আলীর (আঃ) সাথে ইয়েমেনে ছিলাম। যেহেতু তিনি খুমসের মাল (গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ) থেকে একজন দাসী নিয়েছিলেন, সেহেতু তাঁর প্রতি আমার বেশ ক্ষোভ ছিল।
যখন মদীনায় ফিরে আসলাম তখন রাসুল (সাঃ) এর নিকট তাঁর দাসী সম্পর্কে নালিশ করতে চাইলে কিছু সংখ্যক লোক সমর্থন করল যাতে হযরত আলী (আঃ) এর মর্যাদা রাসুল (সাঃ) এর দৃষ্টিতে অবনত হয়ে যায় ।
রাসুল (সাঃ) এসব কথাবার্তা দরজার পিছন হতে শুনতে পেলেন।
রাসুল (সাঃ) ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, ‘ তাঁদের পরিনাম কি হবে যারা আলীর প্রতি বিদ্বেষ পোষন করে ! স্মরন রেখ, যে আলীর প্রতি ঈর্ষা করে সে আমার প্রতি ঈর্ষা করল এবং যে আলী থেকে পৃথক হল সে আমার থেকেও পৃথক হয়ে গেল। নিশ্চ য়ই আলী আমার থেকে, আর আমি আলী থেকে। আলী আমার মাটি থেকে সৃষ্ট, আর আমি ইব্রাহিমের মাটি থেকে এবং আমি ইব্রাহিম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ’।
অতঃপর তিনি (সাঃ) আলোচ্য আয়াতটি পাঠ করে বললেন,
‘হে বুরাইদা ! সেই দাসীর তুলনায় আলীর হক আরও অনেক বেশী’। সূত্র -সাওয়ায়েকে মুহরিক ও তাফসীরে দুররে মানসুর, ৬ষ্ট খন্ড, পাতা -১৮ ।
হযরত মাওলায়ে কায়নাত আ: বলেন –
অর্থ: হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “ক্বিয়ামতের দিন আমি নিজেই চার শ্রেণীর লোককে খাছভাবে সুপারিশ করবো।
১. যে ব্যক্তি আমার বংশধর তথা আহলে বাইত এবং আওলাদে রসূলদেরকে সম্মান করবে।
২. যে ব্যক্তি আহলে বাইত এবং আওলাদে রসূলদেরকে অর্থ-সম্পদ দ্বারা খিদমত করবে।
৩. যে ব্যক্তি আহলে বাইত এবং আওলাদে রসূলদেরকে কাজে-কর্মে সহযোগিতা বা খিদমত করবে।
৪. যে ব্যক্তি আহলে বাইত এবং আওলাদে রসূলদেরকে মনেপ্রাণে গভীরভাবে মুহব্বত করবে।”
(বিহারুল আনওয়ার-৮/৪৯, যখায়িরুল উক্ববা-১৮)
আনা আলীউন মীন নুরী ওয়াহেদ” “আমি ও আলী একখন্ড নুর হতে সৃষ্টি” -সহী বুখারী।
বংশ ধারা ছেলেকে দিয়ে মেয়েকে দিয়ে নয়। কিন্তু এর ব্যতিক্রম হয়েছে দুই জায়গায়।
১.হযরত ইমরানের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। কন্যা হযরত মরিয়মের সন্তান হযরত ঈসা (আ:) কে ইমরানের পুত্র বলে কোরআনে ঘোষনা করা হয়েছে। সুরায়ে আল ইমরান।
২.বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (দ:) এর বেলায় একই ব্যতিক্রম হয়েছে। হযরত মোহাম্মদ (দ:) এর কোন পুত্র সন্তান ছিল না। কিন্তু মা ফাতেমা (আ:) এর দুই সন্তান ইমাম হাসান(আ:) ইমাম হোসাইন (আ:) কে নবী সন্তান বলে ঘোষনা করেছেন। সুরা আল ইমরানের ৬১ নং আয়াতে নবীর সন্তান বলা হয়েছে। উনাদের থেকেই সৈয়দ বংশের যাত্রা শুরু।
ইমাম আলী ও মা ফাতেমা (আ:) ছিলেন মাসুম(নিষ্পাপ )।তাদের দুই সন্তানও ছিলেন মাসুম। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আ:) এর স্ত্রী মাসুম ছিলেন না। তার উরুসে ইমাম জয়নাল আবেদিন(আ:) মাসুম। এইভাবে চলতে থাকে ইমাম মাহদী (আ:) পর্যন্ত। সুতরাং মাতা নয় পিতার ঔরুস জাতই বিবেচ্য।ইমাম আলী আ: এর ওরুসে এবং নবী নন্দিনী মা ফাতেমা (আ:) এর গর্ভে সন্তান হাসান ও হোসাইনের বংশধারার নবী মোহাম্মদ (সা:) বংশধরগণকে সৈয়দ বলা হয়।উনাদের থেকেই শুরু হয় সৈয়দ বংশের যাত্রা। আরব দেশের বিখ্যাত বংশ “সৈয়দ” বংশ। এদেশে সৈয়দগন আরব ভুমি থেকে মুলত ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ আগমন। পরবর্তীতে এদেশে স্থায়ী হয়ে যান।তাদের বংশধরগন আজো আমাদের দেশে রয়েছেন।
আমাদের দেশেও এই বংশের কদর অনেক। জাত-পাত আক্রান্ত ভারতীয় উপমহাদেশে সৈয়দদের শান্তির বানী মানুষদের উপকৃত করেছিল। রুট কানেকশন এবং ঐতিহ্য অনেক শক্তিশালী হওয়াতে একটা সময় সৈয়দ বংশের প্রাদূর্ভাব শুরু হয়। সৈয়দ যেহেতু মুসলিম উম্মার প্রবর্তকের বংশধারার উপাধী, একারনে মুসলমান সমাজে এই লকবটার ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্য আকাশচুম্বি। আর ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা প্রাপ্তি বা অর্জনের লোভ মানুষের স্বভাবজাত।
ফলে দেখা যায় ডানে সৈয়দ, বামে সৈয়দ, ঘড়ে সৈয়দ, বাইরে সৈয়দ.. সৈয়দ সৈয়দ আর সৈয়দময় (নকল সৈয়দ)।
কোন বংশের ছাওয়াল তুমি? বৃক্ষ তোমার নাম কি? ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
হাহাহাহা, বলবেন হাঁসছি কেন? সুখ -দুঃখে সব মিলিয়েই একটু হাসালাম। মানুষ যখন নিজের নামের প্রতি ভড়সা হারিয়ে ফেলে তখন তাকে বংশ পরিচয়ের মুখাপেক্ষী হতেই হয়। ১৪ পুরুষের নাম বেঁচে টিকে থাকার লড়াই চালাতে হয়, ১৪ পুরুষ ইতিহাসের সাক্ষী গোপাল হতে হয়। যার কুফল সরুপ দেখতে পাই সৈয়দদের নাম ব্যাবহার করে চুরি চামারী থেকে শুরু করে যৌতুক গ্রহণ, ব্যাভিচার, ডাকাতি, মহাজনী, সুদের কারবার সব কিছুতেই দেখা গেল সৈয়দ বংশীয়রা জড়িয়ে পরছে (নকল সৈয়দ)। মহা বিপদ! স্বভাবগতভাবে তাদের আসল পরিচয় বেরিয়ে আসে যা সৈয়দ বংশীয়দের ধর্মীয় ওসামাজিক মর্যাদার পরিপন্থী নয়।
ছোটবেলায় একটি গল্প মনে পড়ে গেল জানিনা এর সত্যতা তবে তখন খুব মজা পাইছিলাম। দাঁড়ান বলি সেই মজার ঘটনাটা:-
যখন ডানে সৈয়দ, বামে সৈয়দ, ঘড়ে সৈয়দ, বাইরে সৈয়দ.. সৈয়দ সৈয়দ আর সৈয়দময় এমন সময় আরব প্রশাসন শুদ্ধী অভিজান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।ঘোষনা আসে জুম্মার দিনে বিশেষ মাঠে, সকল সৈয়দ একত্রীত হবে সব সৈয়দ বিশেষভাবে প্রস্তুত আগুনের গোলকের ভেতর দিয়ে লাফ দেবে। অনেকটা সার্কাসপার্টির ফায়ার জাম্পের মত।
সৈয়দদের ওপর আল্লার আদ্ধাত্মিক আনুকুল্য আছে তাই আগুনের গোলকে তাদের কোন ক্ষতি হবে না। এপার থেকে অন্য পারে লাফ দেবার পরেও, আইরন করা জিব্বাতে ভাজ পড়বে না। নির্দিষ্ট দিনে দেখা গেল অর্ধেকের বেশী সৈয়দ মাঠে অনুপস্থীত। বেত্রাঘাতের ভয়ে, আগুনে ঝলসানোর ভয়ে পাগারপার….।
যারা অগ্নি গোলক খেলতে আসে নাই তাদের আর কক্ষনোই আরবের মাটিতে দেখা যায়নি। এভাবেই আরবে জেনেটিক্যালি শুদ্ধ সৈয়দ প্রতিষ্ঠালাভ করে।
প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এই বংশের সাথে কোনা যোগসূত্র না থাকলেও বাংলাদেশের অনেক মুসলমান পরিবার (নকল সৈয়দ পরিবার) সৈয়দ বংশ পদবী ব্যবহার করে নিজেদের সম্ভ্রান্ত ও কুলীন মুসলমান বলে দাবি করে থাকেন। বাঙালি মুসলমান সমাজে সৈয়দ পদবীর অপব্যবহার ও পক্ষেপণ ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। প্রকৃত পক্ষে সৈয়দ নন এবং পারিবারিক কোন কুলীন পদবীও নেই, অথবা পূর্ব পদবী ঐতিহ্য পরিত্যাগ করতে ইচ্ছুক এমন অনেক বংশ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বিশেষে বাংলাদেশে সৈয়দ পদবী আরোপিতভাবে ব্যবহার শুরু করেছে। প্রচুর বাঙালি মুসলমান রয়েছে যারা পূর্ব ঐতিহ্যগত ভাবে সৈয়দ নন, অথচ তাদের নামের পূর্বে পদবীর ব্যবহার শুরুকরে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার পরিচয়বাহী সংক্ষিপ্ত শব্দ বা শব্দ গুচ্ছ যথা ‘এস-এম’ যুক্ত করে থাকেন। বস্তুত এস.এম হচ্ছে ‘সৈয়দ মোহাম্মদ’ অথচ ব্যবহারকারীরা অনেক সময়ই তা পুরোপুরি ভেঙে লেখেন না হয় তো ভয়ের কারণে।
ঐতিহ্যকে ধারন ও লালন করাও মানুষের আরেকটা বৈশিষ্ট। আর এসব কারনেই যখন মানুষ অর্থবিত্ত শিক্ষা সহ যাবতীয় দিক দিয়ে সচ্চল হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে সম্মান ও ঐতিহ্যের একটা ম্পিহা কাজ করে। সম্মান জিনিসটা তার প্রচেষ্টা দ্বারা অর্জন করে নিতে পারলেও ঐতিহ্য জিনিসটা তার পক্ষে কোন ভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এ সমস্যা থেকে উত্তোনের জন্যই সে যে কোন কায়দায়ই হোক সৈয়দ লকবের দিকে হাত বাড়ায়।
সৈযদ লকব প্রহৃত হওয়ার আরেকটা সাম্প্রতিক কালের বড় কারন পিরগিরি বা সাধুসন্ত পেশায় সহজ ও উচ্চমান প্রভাব।
উসমানিয়া খেলাফতি যুগে মাতৃরিস্তায় সৈয়দ লকব ধারনকে একে বারে বৈধ করে দেয়া হয়েছিল। সৈয়দ বেড়ে যাওয়ার এ আরেক কারন। যার ফলে সৈয়দ বংশে বিবাহ করে তার সন্তান থেকে সৈয়দ লিখা শুরু করে দেন।তাদের ভাষ্য হল মা থেকে সৈয়দ বংশ শুরু। কিন্তু ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাস বলে অন্য কথা। বংশ কখনো মা থেকে শুরু হয় না সব সময়ই বাবা থেকে। বংশ সিজরাগুলো উল্টালে দেখতে পাই আজ নয় আদিকাল হতেই পিতা থেকে বংশ ধারা প্রবাহিত।মুলত মাওলায়ে কায়নাত ইমাম আলী (আ:) থেকেই সৈয়দ বংশের শুরু(স্বীকৃত)।
কেউ কেউ আবার সৈয়দ বাড়ির আশে-পাশে বসবাস করতেন পরে অন্যত্র চলে গিয়ে সৈয়দ লিখাচ্ছেন। শুধু সৈয়দ আর সৈয়দ, মুল খুঁজলে কিছুই মিলে না সব নকল।
বাঙালির বংশ পদবীর ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন নয়। মধ্যযুগে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলে পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমান্তরালে বাঙালির পদবীর বিকাশ ঘটেছে বলে মনে করা হয়।
বাঙালির জমি- জমা বিষয় সংক্রান্ত কিছু পদবী যেমন- হালদার, মজুমদার, তালুকদার, পোদ্দার, সরদার, প্রামাণিক, হাজরা, হাজারী, মন্ডল, মোড়ল, মল্লিক, সরকার, বিশ্বাস ইত্যাদি বংশ পদবীর রয়েছে হিন্দু -মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের একান্ত রূপ। বাঙালি মুসলমানের শিক্ষক পেশার পদবী হলো-খন্দকার, আকন্দ, নিয়াজী ইত্যাদি। আর বাঙালি হিন্দুর শিক্ষক পদবী হচ্ছে দ্বিবেদী, ত্রিবেদী, চর্তুবেদী ইত্যাদি।
বাঙালির আরও কিছু বিখ্যাত বংশ পদবীর যেমন-শিকদার, শেখ, মীর, মিঞা, মোল্লা, দাস, খন্দকার, আকন্দ, চৌধুরী, ভুইয়া, মজুমদার, তরফদার, তালুকদার, সরকার, মল্লিক, মন্ডল, পন্নী, ফকির, আনসারী, দত্ত ইত্যাদি।
বিশেষ করে মীর, খন্দকার, শাহ শেখ, মিঞা, ফকির, শিকদার ছিলেন তারাও সৈয়দ লিখা শুরু করে দিয়েছেন। শুধু সৈয়দ আর সৈয়দ, মুল খুঁজলে কিছুই মিলে না সব নকল। এবার দেখা যাক উগরোক্ত পদবীগুলোর ইতিহাস কি বলে:-
শিকদারঃ সুলতানি আমলে কয়েকটি মহাল নিয়ে গঠিত ছিল এক একটি শিক। আরবি শিক হলো একটি খন্ড এলাকা বা বিভাগ। এর সাথে ফারসি দার যুক্ত হয়ে শিকদার বা সিকদার শব্দের উদ্ভব হয়েছে। এরা ছিলেন রাজস্ব আদায়কারী রাজকর্মচারী। শব্দকোষে যাকে বলা হয়েছে শান্তিরক্ষক কর্মচারী। এরা শিক বন্দুক বা ছড়ি বন্দুক ব্যবহার করতো বলে শিকদার উপাধী পেয়েছিল; সেই থেকে বংশ পরমপরায় শিকদার পদবীর বিকাশ ঘটে।
শেখঃ শেখ আরবি থেকে আগত পদবী। সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের সম্মানসূচক বংশ পদবী শেখ। যিনি সম্মানিত বৃদ্ধ অথবা যিনি গোত্র প্রধান, তাকেই বলা হতো শেখ। হযরত মোহাম্মদ (সঃ) সরাসরি যাকে বা যাঁদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন, তিনি বা তার বংশ ধরও শেখ নামে অভিষিক্ত হতেন অথবা শেখ পদবী লাভ করতেন। বাঙালি মুসলমান সমাজে যারা শেখ পদবী ধারণ করেন, তারা এ রকম ধারণা পোষণ করেন না যে, তারা বা তাদের পূর্ব পুরুষরা এসেছিলেন সৌদী আরব থেকে। বাঙালি শেখ পদবী গ্রহণের নেপথ্যে রয়েছে ঐ পূর্বোক্ত চেতনা। নবীর হাতে মুসলমান না হলেও বাংলায় ইসলাম ধর্ম আর্বিভাবের সাথে সাথে যারা নতুন ধর্মকে গ্রহণ করে নেন; নও মুসলমান’ হিসেবে প্রাচীন ও মধ্যযুগে তারাই শেখ পদবী ধারণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের বংশের উত্তর সূরীরাই শেখ পদবী ব্যবহার করে এসেছেন। এমনিতে অন্য ধর্মের লোকের কাছে মুসলমান মানেই শেখ বা সেক। কেউ কেই শেখ কেউ সেক কিংবা কেউ বা শেখ এর রূপান্তর শাইখও ব্যবহার করে থাকেন।
মীরঃ মির বা মীর শব্দটি এসেছে আরবি থেকে। আরবি শব্দ আমীর’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে মীর। সেই অর্থে মীর অর্থ দলপতি বা নেতা, প্রধান ব্যক্তি, সরদার ইত্যাদি। জিতে নেয়া বা জয়ী হওয়া অর্থে মীর শব্দের ব্যবহার হতো। তবে মীর বংশীয় লোককে সম্ভ্রান্ত পদবীধারীর একটি শাখা বলে গাবেষকরা মনে করেন।
মিঞাঃ মিঞা মুসলিম উচ্চ পদস্থ সামাজিক ব্যক্তিকে সম্বোধন করার জন্য ব্যবহৃত সম্ভ্রম সূচক শব্দ। এক অর্থে সকল মুসলমানের পদবীই হচ্ছে মিঞা। বাঙালি হিন্দুর মহাশয়’ এর পরিবর্তে বাঙালি মুসলমান মিয়া শব্দ ব্যবহার করে থাকে। মিঞা’ শব্দটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। প্রভু বা প্রধান ব্যক্তি বুঝাতেও মিয়া শব্দের প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। তবে গ্রামীন প্রধান বা সর্দার অর্থের মিঞা পদবী হিসেবে বাঙালি মুসলমান সমাজে ঠাঁই পেয়েছে।
খন্দকারঃ মুসলিম সমাজের ফারসি শিক্ষক হিসেবে খোন্দকার বা খন্দকারের পরিচয় পাওয়া যায় । অন্য দিকে খোন্দকারের ‘ পদবী এসেছে সামন্ত সমাজ থেকে পেশাজীবী হিসেবে। সাধারণ ভাবে খোন্দকার বা খন্দকার অর্থ হচ্ছে কৃষক বা চাষাবাদকারী। মনে করা হয় ফারসি কনদহ ‘ এর যার অর্থ কৃষি’সাথেকার যুক্ত হয়ে কনদহকার> খনদহকার>খন্দকার হয়েছে। ভিন্ন মতে, খন্দকারের মূল উৎপত্তি সংস্কৃত কন্দ> খন্দ যার অর্থ ফসল বলা হয়েছে। এই খন্দ এর সাথে কার যুক্ত হয়েও খন্দকার> খোন্দকার হতে পারে। এবং এতেও পূর্বের খন্দকার’ শব্দের উৎসের অর্থের তারতম্য ঘটছে না। আবার ফারসি ভাষায়, খোন্দকার বলে একটি শব্দ আছে যার অর্থ শিক্ষক। সেখান থেকেও খোন্দকার পদবী আসা বিচিত্র কিছু নয়। অথবা খোন্দকার শব্দের যে ভিন্নভিন্ন অর্থ তার সবগুলো মিলিত তাৎপর্য থেকেই বিভিন্নভাবে খন্দকার পদবীর উৎপত্তি হয়েছে।
শাহ ফকিরঃ মুসলমানদের মধ্যে সন্ন্যাসবৃত্তি’ থেকেই এসেছে শাহ ফকির’ পদবী। মরমী সাধকরা গ্রহণ করতেন শাহ ফকির’ পদবী। এটি আরবি শব্দ, যার মূল অর্থ নি:স্ব। আবার আরবি ফকর শব্দের অর্থ দারিদ্র। এ থেকে ফকির শব্দের উৎপত্তি। ফকির এবং পার্শি দরবেশ ব্যক্তিগণ সাধারণত এদেশে শাহ ফকির নামে পরিচিত। বিশেষ কোন ধর্ম মতের একান্ত অনুসারী না হয়ে যারা সকল ধর্মের মূলনীতি নিয়ে আত্মতত্ত্বের সন্ধান করেন তাদেরকেও শাহ ফকির বলা হয়। আবার সুফি বা বাউল তত্বের ধারকরাও শাহ ফকির লেখেন।
সাহেব /বিশেষ্য পদ/ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, মহাশয়, মালিক, যা ধর্মীয় অর্থে এই উপমহাদেশে প্রচলিত।
“সাহেব” শব্দ সন্ত্রাস্ত বা সন্মানিত ব্যক্তি –এই অর্থে ” মুসলমান যুগে আমাদের দেশে প্রচলিত হয়। মুসলমান যুগের পূৰ্ব্বে বাংলায় “বাবা” (পিতা এই অর্থে) স্থলে “বাপু” শব্দ ব্যবহৃত হইত বলিয়া বোধ হয় । এখনও নিম্নশ্রেণীর মধ্যে অনেক স্থলেই “বাবার” পরিবর্তে “বাপু” যলিয়। পিতাকে আহ্বান করিতে শুনা যায়। এই বাংলা “বাপু” ও ফার্সী “বাবা” শব্দে সংমিশ্রণে বোধ হয় উর্দুতে বাবু শব্দের প্রচলন হয় এবং ক্রমে ক্রমে উহার অর্থ সম্প্রসারণ ঘটে (জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধান দ্রষ্টয্য)। পূৰ্ব্বে এই “বাবু’ শব্দে রাজবংশীয় ব্যক্তিগণের বা উচ্চপদস্থ জমিদারবর্গেরই একচেটিয়া অধিকার ছিল বলিয়। বোধ হয়। কিন্তু ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পাণীর প্রথম যুগে এই “বাবু” শব্দ কোম্পানীর আশ্রিত · পারসী ও ইংরেজী ভাষায় সামান্য অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের প্রতি প্ৰভু? হওয়ায় ইহার অর্থ-গৌরব অনেক পরিমাণে হ্রাস প্রাপ্ত হইয়া বৰ্ত্তমানে ইহা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের নামের পরে ব্যবহৃত সৌজন্ত বা ভদ্রত প্রকাশক শব্দমাত্রে পর্য্যবেশিত হইয়াছে । এই “বাবু’ শব্দ এখন ইংরেছি Mr. & Esquire “to তুল্যর্থবাচক} আরবী “সাহব’ শব্দ হইতে এই “সাহেব’ শব্দের উৎপত্তি (জ্ঞানেজমোহন দাসের অভিধান দ্রষ্টব্য)। আরবি ‘সাহব’ শব্দের অর্থ হল সহচর, সঙ্গী বা সাথী। আরবিতে এ ‘সাহব’ শব্দ থেকে তৈরি হয়েছে ‘সাহাবি’। বাংলা ‘সাহেব’ ও আরবি ‘সাহব/সাহাবি ‘ শব্দ সম্পর্কের দিক থেকে অভিন্ন হলেও দেশভেদে এক।মুসলমানদের রাজত্বকালে এই “সাহেব’ শব্দ ফকির, মৌলবী ও সন্ত্রাপ্ত ব্যক্তিদিগের নামেই প্রযুক্ত হইত। মূলতঃ অর্থে যিনি আল্লাহ পাককে পাইয়ে দেবার ক্ষেত্রে বা আল্লাহ পাক এর সাথে রূহানী সংযোগ করে দেয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, উনাকেই সাহেব বলা হত। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর যখন ইংরেজরাই বাংলা দেশের সর্বময় কৰ্ত্ত হইয়া উঠিল, তখন সঙ্গম-ৰাচক সাহেব’ শব্দ হিন্দু বা মুসলমানদিগের অপেক্ষ তাহদের প্রতিই অধিকতর প্রযুক্ত হইতে থাকায় এই “সাহেব’ শব্দ তরঙের অন্তান্ত প্রদেশে নানা অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়।
যেমন ধরুন:- সংস্কৃত লট্ট থেকেও বাংলায় লাট শব্দটি এসেছে। মূলে সংস্কৃত লট্ট অর্থ নষ্ট স্বভাব, দুর্জন। এ কারণে নষ্ট, দুষ্ট, গর্বিত, অহংকৃত, দাম্ভিক অর্থেও লাট শব্দটি প্রচলিত। আবার বাংলায় লাট শব্দটি রঙ্গ তামাশা বা ব্যঙ্গচ্ছলে ইয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয় (কি লাট! খবর কি?)। প্রভু বা সর্বময় কর্তা অর্থেও লাট শব্দের প্রয়োগ রয়েছে (ভারি আমার লাট এসেছেন)। সংস্কৃতেও লাট শব্দটি রয়েছে। আর সংস্কৃ ত ‘লাট’ অর্থ দক্ষিণ গুজরাটের প্রাচীন নাম, পণ্ডিত, রসজ্ঞ, জীর্ণ বস্ত্রাদি।
যাইহোক উপরোক্ত আলোচনা থেকে একটা বিষয় ক্লিয়ার উনারা সম্ভান্ত্য পরিবার কিন্তু সৈয়দ পদবীর সাথে কোন যোগসুত্র পাওয়া যায় না। এরকম শতাধিক বংশ পদবী রয়েছে আমাদের দেশে। বাঙালির পদবীর ইতিহাস বৈচিত্র পথ ও মতের এক অসাধারণ স্মারক হিসেবে চিহিৃত। আমার পশ্ন তবে কেন উনারা সৈয়দ হওয়ার এত খায়েস?চলমান কালে সৈয়দ লকব প্রহৃত হওয়ার সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে একটি মতলবি ও মিথ্যা প্রচারনা, সেটা হল- সৈয়দ লকব অর্জনযোগ্য। অথচ সৈয়দ হচ্ছে বরাবরই একটা বংশ বা রক্ত পরম্পরা লকব।
বিভিন্নভাবে কাগজপত্র তৈরী করে সিজরা বানিয়ে বিভিন্ন পথ ধরে বিভিন্ন সুএ ধরে নকল সৈয়দ লকবের বৃথা প্রবণতা। এই বৃথা সময় নষ্ট না করেও সততাও ইলমের মাধ্যমে সৈয়দের স্থানে যাওয়া যায়। বিখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান ফার্সী প্রতি নবী (দ:) এতই সন্তুষ্ট ছিলেন যে বলতে বাধ্য হয়েছেন “সালমান মিন্নি আহলে হাইতি” অথ্যাৎ সালমান আহলে বাইতের অন্তভুক্ত। অনেক বড় সম্মান পেয়েছিলেন তিনি।
আমার পরদাদা হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মোহাম্মদ ঈসমাইল (রহ:) এর খলিফা মজ্জুব ওলী শাহ কলন্দর ফকির যিনি “দরঘা পুতি” নামে খ্যাত ছিলেন (পুরাসুন্দা গ্রামের নিবাসী)। যিনি তার সমস্ত সম্পত্তি হযরত শাহ কারার (ফুলশাহ) রহ: দরঘার নামে ওয়াক্‌ফ করে এখানে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। আমাদের পরিবারের মুরিদ হওয়া শর্তেও উনাকে আমার বাপ-চাচারা কদম বুচি করতেন। তিনি আপন কর্ম এ ইলমের দারা সম্মানের অধিকারী হন।এর জন্য উনাকে সৈয়দ লকব লাগাতে হয়নি।
কয়েক বছর আগের ঘটনা। আমি তখন আমাদের বাড়িতে (সুরাবই সাহেব বাড়ি, দরবার শরীফ, হবিগঞ্জ) অবস্খান করছিলাম। পরের দিন জাতীয় নির্বাচন। কি কারনে যেন ভোটার তালিকা আমার হাতে আসল, পড়তে শুরু করলাম। মনে হচ্ছিল ভোটার তালিকা নয় কোন সৈয়দ বংশের নসব নামা (বংশ সিজরা)পড়ছি। তালিকায় ডানে -বামে,উপরে-নিচে শুধু সৈয়দ আর সৈয়দ, যেন সৈয়দ এর বাজার। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার দাদার শিষ্য পুরাসুন্ধা গ্রামের মরহুম ভিংরাজ পুতি বলছিল “বাবারে আপনারা এক ঘর সৈয়দ ছিলেন কোন আপন লোক ছিল না, আজ আপনাদের আশে-পাশে ঘরে ঘরে নিজের লোক।ভালই হইছে ধরবন বাড়ছে”। হাহাহাহা বেশ মজা পাইছিলাম তখন সেই কথায়।
সৈয়দ কোন জাদুবিদের লকব নয় রে ভাই, সৈয়দ হল ধার্মিকের লকব। আর ধর্ম তথা আধ্যাতিকতার সাথে কেরামতির যে যোগসূত্র সেটার এখতিয়ার সযং স্রষ্টার। এখানে আসলে সাধকের এখতিয়ার নেই। স্রষ্টাই তাঁর নিকটতম উপাসককের মর্যাদাপ্রকাশ বা জাহের করার জন্য বা কোন বিপদ থেকে রক্ষার জন্য কিংবা কোন ব্যাক্তি বা গুষ্টিকে বিপদমুক্ত করা বা বিপদগ্রস্থ করার উছিলা হিসাবে তাঁর যখন ইচ্চা, যেভাবে ইচ্ছা, যতটা ইচ্ছা তাঁর সেই প্রিয় বান্দার মাধ্যমে আরুপ করেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশধরদের সম্মান ও মর্যাদার কথা পবিত্র কুরআন এবং হাদীসে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হওয়ায় মুমীন-মুসলমানদের অন্তরে তাঁদের জন্য ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অন্য যেকোন মানুষ থেকে অনেক বেশি। এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, রাসুলে পাক আলাইহিস সালাতু ওয়াসালাম এর পবিত্র বংশ হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বংশ।
এ প্রসঙ্গে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, ‎افضل النو ع الانسن- كما قال الفضر الرازى
“হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র বংশ হচ্ছে, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ বংশ।”
সৈয়্যদগণের মর্যাদা সম্মান এবং শান-শওকত দেখে কিছু মিথ্যাবাদী-স্বার্থপর নিজেদেরকে নবী বংশের অর্থাৎ সৈয়্যদ বলে দাবী করে বসে। আমাদের সমাজেও এমন অনেকেই আছে যাদের বংশের ঠিক নাই, নসবনামা নাই কিন্তু নিজেদেরকে সৈয়্যদ বলে দাবী করে। অথচ আদৌ তারা সৈয়্যদ নয়, এমনকি তাদের আসল বংশ সম্পর্কেও তারা অবগত নয়, বাপ দাদার মুখে শুনে নিজেরা নামের আগে সৈয়্যদ ব্যবহার করে। এই সমস্ত নালায়েকের অবস্থা যে কি হবে, তা গায়েবের খবর দেনে ওয়ালা রাসূল অনেক আগেই ফয়সালা করে দিয়ে গেছেন, এবং এসকল মিথ্যুকদেরকে জাহান্নামী বলে ঘোষনা করেছেন।
যেমনঃ বুখারী এবং মুসলিম শরীফের হাদীসে এসেছে যে,
‎عن أبى ذر أن النبى صلى الله عليه وسلم قال: ليس من رجل ادعى لغير أبيه وهو يعلمه إلا كفر، ومن ادعى قوماً ليس له فيهم نسب فايتبو أ مقعده من النار.
হযরত আবু যর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিঁনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও অপর কাউকে পিতা বলে দাবী করে, সে কুফরি করলো। আর যে নিজেকে এমন বংশের লোক দাবী করে, যে বংশের সাথে তার আদৌ সম্পর্ক নাই, সে ব্যক্তি নিজের ঠিকানা জাহান্নামে তৈরী করে নিলো।
(সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
আবার অনেককেই দেখা যায় মাতার বংশের দিক দিয়ে সৈয়্যদ কিন্তু পিতার বংশের দিক দিয়ে অন্য বংশের। এক্ষেত্রে মাতার দিক থেকে সৈয়্যদ হলেও কেউ নিজেকে সৈয়্যদ বলে দাবী করতে পারবে না। পিতার বংশ দ্বারাই পুত্রের বংশ নির্ণীত হবে মাতার বংশ দ্বারা নয়। কারন, এই বিষয়েও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফয়সালা করে দিয়ে গেছেন। যেমন,
‎الحديث الثلانون: أخرج الطبى عن فاطمة الزهر اءرضى الله عنها قالت: قال رسول الله صلى الله عليه كل بنى أم ينتمون إلى عصبتهم، إلا ولدى فاطمة، فأنا وليهما وعصبتهما ؛
ইমাম তাবারানী হযরত সাইয়্যেদাতুনা ফাতিমাতুয যাহরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিঁনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “প্রত্যেক মায়ের সন্তানেরই বংশীয় সম্পর্ক নির্ণীত হয় তাদের পিতার দিক দিয়ে। কিন্তু ফাতিমার সন্তানদের ব্যতিত। কেননা, আমিই তাঁদের অভিভাবক এবং বংশীয় উর্ধ্বতন পুরুষ। তাই আমার দিকেই তাদের বংশ নির্ণীত হবে।
(আল মু’জামুল কবীর, ৩:৪৪, হাদীস নং- ২৬৩২; আবু ইয়ালা, ৬:১৬১, হাদীস নং- ৬৭০৯; আল মাকাসিদুল হাসানা, ইমাম সাখাভী, পৃ. ৩৮১)
এ বিষয়ে ইমাম তাবারানী বর্ণিত আরেকটি হাদীস শরীফ বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য,
ইমাম তাবারানী হযরত উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিঁনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “প্রত্যেক নারীর ঔরসজাত সন্তানদের বংশ পরিচয় নির্ণয় হয় তাদের পিতার দিক থেকে।শুধু (আমার কন্যা) ফাতিমার (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র সন্তানগণ ব্যতিত। (অর্থাৎ, ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সন্তানগণের বংশ পরিচয় হবে মাতার দিক দিয়ে, পিতার দিক দিয়ে নয়) কেননা, আমিই তাদের আসাবা এবং আমিই তাদের পিতার স্থলাভিষিক্ত (অভিভাবক হিসেবে)।
( আল মু’জামুল কবীর, ৩:৪৪, হাদীস নং- ২৬৩১; মাযমাউল যাওয়ায়েদ, ইমাম হাইছামী, ৪দগ: ২২৪)
হাদীসে আছে :- যারা নকল সৈয়দ অর্থাৎ সৈয়দ না হয়েও নামের আগে সৈয়দ লেখান তাদের শেষ বিচারের দিন জিহ্বার কেটে ফেলা হবে।
‎من ادعي الي غيابيه فعليه لعنة الله والملاءكته والناس اجمعين لا يقبل الله منه يوم القيامة صرفا ولاعدلا.
:-যে বংশ তথা পৃত্রিপরিচয় গুপন করবে কিংবা নিজ পিতাকে অস্বীকার করে অন্যের পিতাকে নিজ পিতা ম্বাব্যস্থ করে নিজ বংশের দাবী করে,তাদের উপড়ে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত,ফেরেশতাকুল, মনুষ্যকুলের অভিশাপ্ত। রোজ কিয়ামতে মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জের তাদের ফরজ, নফল কোন ইবাদতই কবুল করবেন না৷ (ফতওয়ায়ে রেজভীয়া ৭ম খন্ড,পৃঃ৬৭৬)
সৈয়দ না হতেও যারা সৈয়দ লিখেন সময় থাকতে সাবধান হওয়া উচিত। এর পরিনাম খুব খারাপ ও ভয়াবহ। এ দেশ কেন সারা বিশ্বেই কিছু কিছু ইতিহাস বংশপরস্পরায় মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে। যার কোন লিখিত দলীল নেই।ঠিক আমরা সৈয়দগনের ইতিহাস লিখি আর নাই লিখি হাজার বছর মুখে মুখে যে ইতিহাস রচিত হয়ে আসছে তার থেকে এ দেশ তথা সারা বিশ্বর মানুষ জানে কারা সৈয়দ আর কারা সৈয়দ নয়।