তিনি কে ? আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী

0
725

তিনি কে?

সাদিক শিরাজী :

ফেসবুকে নাই তিনি। তিনি নাই ইউটিউবে। তিনি নাই ইন্টারনেটে। তিনি মানুষের জটলায় থাকেন না। তিনি প্রচলিত মাহফিলের পোস্টারে থাকেন না। তিনি কারো বাড়িতে সহসাই যেতে চান না। তিনি কারো কষ্টের কারণ হতে চান না।

তিনি যিকরুল্লাহর মজলিসে যান। তিনি এতিমের মাহফিলে যান। তিনি দুঃস্থ মানুষের কাছে বসেন। তিনি রিকশা বিতরণে আছেন। তিনি এতিমের নৌকায় উঠে বসেন। তিনি এতিমদের গোসল করান সস্নেহে। তিনি মেডিকেলে রোগীর খোঁজ রাখেন। তিনি বিধবার ঘর বানান। মসজিদ করে দেন। লঙ্গরখানা করে দেন। তিনি ব্রিজ করে দেন মানুষের পারাপারের জন্য। তিনি চাল, ডাল, কেরোসিন বিতরণ করেন। তিনি বন্যা, খরা, জলোচ্ছাসে ভেসে যাওয়া মানুষের সাথী। তিনি বৃদ্ধ—বৃদ্ধার ঘরের বাতি। তিনি সবহারাদের বন্ধু-স্বজন।

তিনি শিশুদের বড় ভালোবাসেন। তিনি সবার সুখে হাসেন। তিনি উদার মনের মানুষ। তিনি দরসে বুখারীর শায়খ। তিনি দুরুদের মজলিসে বসেন। তিনি ইলমে কিরাতের ইমাম শ্রেণীর খাদেম। তিনি জ্ঞানের উপমা। তিনি প্রজ্ঞার দ্যুতনা। তিনি সব কল্যাণের সাথে চলেন। তিনি এ যুগের আলোর নকীব।

তিনি কাউকে কাফির কাফির বলেন না। তিনি মুনাফিকদের দলেও চলেন না। তিনি ঘৃণার চাষ করেন না। তিনি জৌলুশ নিয়েও চলেন না। তিনি সাদাসিধে। সবার। সকলের। মানুষের। মানবতার। তিনি গর্বের ধার—ধারেন না। মাওলানা, আল্লামা লিখেন না। তিনি চলমান স্রোতের বিপরীত। যিকির, ফিকির, দুআ, তসবিহ, শোকর, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল এসবের নূরে নূরানী। তিনি এ সময়ের, এই উম্মাহর কাঙ্ক্ষিত মানুষ। তিনি নবীজি (সা)—এর প্রকৃত অনুসারী।

তিনি কারো মুরশিদ। কারো কাছে বড় ছাব। কারো পিতা। কারো উস্তাদ। কারো অভিভাবক। কারো শিক্ষক। কারো কাছে নেতা। কারো কাছে দরবেশ। আসলে তিনি সময়ের প্রেক্ষিতে তুলনাহীন। সবচেয়ে ভালো। সবচেয়ে উন্নত। সবচেয়ে বেহতর। মানবিক উপমা। রূহের চিকিৎসক।

তিনি মানুষের মনে। তিনি মাবুদের ধ্যানে। তিনি সৃষ্টির সেবায়। তিনি আল্লাহর রেদ্বায়। তিনি আছেন। তিনি থাকবেন তার মহান মাওলার ইচ্ছায়।
তিনি কে?
তিনি আমাদের বড় ছাহেব কিবলা ফুলতলী। ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী। ডাকনাম মানিক। বড় ছাহেব বলে মশহুর তিনি এক জগৎখ্যাত জ্ঞানতাপস।

তাঁর পিতামহ মুফতি আব্দুল মজিদ (রহ) ছিলেন প্রসিদ্ধ আলেম। যুগশ্রেষ্ঠ ওলী। সাধকপুরুষ। তেমনি তাঁর মাতামহ হযরত আবু ইউসুফ শাহ মোহাম্মদ ইয়াকুব বদরপুরী (রহ) ছিলেন যামানার পূর্ণিমার চাঁদ। কামিল ওলী। উচ্চমার্গীয় সুফী। ইলমে কিরাত বিশেষজ্ঞ। বাংলা—ভারতের কোটি কোটি সুন্নী জনতার প্রসিদ্ধ মুরশিদ।

তাঁর পিতা তো আরেক আলোর নকিব। সর্বোত্তম আখলাকের স্বার্থক ফেরিওয়ালা। শামসুল উলামা উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। ছিলেন কিরাত বিশারদ। ইলমে হাদীসের জগতে প্রবাদতুল্য শায়খুল হাদীস ছিলেন। ইলমে তাফসীরের নূরানী বিভায় প্রত্যুজ্জল ছিলো তাঁর সিনা মোবারক। রাসূলেপাক (সা.)—এর সিরাত রচনা করে দেখিয়ে গেছেন তাঁর পাণ্ডিত্যের দ্যুতি। সারাজীবন নববী ইলমের আতর বিতরণ করে গেছেন। আপাদমস্তক সুন্নাহভিত্তিক আমলদার এক শতাব্দীসেরা বুজুর্গ ছিলেন। উম্মাহর খিদমতে তাঁর বহুমাত্রিক ভূমিকার কথা জাতি, দেশ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সমাজ—সংসার ছাড়িয়ে বিশ্বভুবন জয় করেছিলো। তিনি আল্লামা আব্দুল লতীফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী। আর মা—জননী ছিলেন আবেদা, সালেহা, যাহেদা এক দুনিয়াবিরাগী মহীয়সী নারী যিনি স্বীয় পিতা বদরপুরী (রহ)’র রূহানী ফায়জ, গহীন রজনীর রোনাজারির সোনালী ফসল লাভ করে ধন্য হয়েছিলেন। সুতরাং তিনি তো বেলায়াতের সমূদ্র মোহনায় জন্ম নেওয়া এক ধন্য সন্তান যার পিতা—মাতার নসবনামা হীরাখচিত অক্ষরে লিখে রাখার মতো।

তিনি তখন শিশু। এক আলোকিত শিশু। পিতার হাত ধরে নানাবাড়ি যাচ্ছেন আজকের দরবেশ। আনন্দে আত্মহারা মন—প্রাণ। একসময় তাঁর নানাজান হযরত বদরপুরী (রহ.)—এর সামনে উপনীত হলেন। দুআ চাওয়া হলো। নানাজান বদরপুরী (রহ.) তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। দুআ করলেন। আদর করলেন। একসময় বললেন—’আমার মানিক পীর হবে, আমার মানিক পীর হবে। (রেফারেন্সঃ মাওলানা নজমুদ্দিন চৌধুরী থেকে শ্রুত)

আজ তো আমাদের চোখের সামনেই সেই দুআর ফসল। সেই দুআ ছিলো এক আধ্যাত্মিক চেতনার নির্যাস। এক রূহানী শক্তির বিস্তার। এক পরিশুদ্ধ আত্মার আরাধনা। এক বাধ্যগত নফসের আকুতি। রাজাধিরাজ মহান মাবুদ তাঁর কথা শোনেছেন। তাঁর দাবি রেখেছেন। ফলে আমরা পেয়েছি সিলসিলার এক মহান আদর্শ। এক মহান ওলী। বেশুমার সুন্নী—জনতার প্রিয় মুরশীদ। মানবতার এক নিঃস্বার্থ ফেরিওয়ালা। যিনি কোনো প্রতিদান কামনা করেন না। একমাত্র রাব্বেকারীমের কাছে উজরত ও কুরবত কামনা করেন। যা একজন দরবেশের আজীবনের পরম প্রাপ্তি ও চরম সম্মানের উপমা হয়ে জাগরূক থাকে বিশ্বময়।

তিনি কে ? :- ১ম ও ২য় পর্ব